Arambagh Times
কাউকে ছাড়ে না
November 30, 2021

কাউকে ছাড়ে না

তোতাকাহিনী ও জেলা বিতর্ক

1 min read
   এক বিশাল বটবৃক্ষ। তাতে থাকতো তোতা আর তুতু। তোতার বউ তুতু। আমি তোতাকে মূর্খ বলেই ভেবে এসেছি। আর আমি নিজেকে ভাবি ঠিক তার উল্টোটাই অর্থাৎ পন্ডিত। কেউ কেউ মহাপণ্ডিত বললে একটু আনন্দে আপ্লুত হয় বইকি! 
 সবেমাত্র দুর্গাপূজা হয়েছে। গতকাল সেই বটের তলা দিয়ে যাচ্ছি। হাতে ছাতা, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মাথার টিঁকি। এগুলো না থাকলে সমাজ মানবে কেন?

মূর্খ তোতা আমাকে প্রশ্ন করলো, ‘বলতো পন্ডিত, রাজা রামমোহন রায় কোন জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন?’
আমি মুচকি হেসে তো তাকে বলেছিলাম ‘আরে,এ তো সহজ প্রশ্ন। এর উত্তরও সহজ। কাউন্সিল কিছুদিন আগে ভুল করে মুর্শিদাবাদ লিখেছিল বটে, আমরাইতো তা সংশোধন করে দিয়ে বলেছি হুগলি জেলা ।ছোটবেলা থেকে আমরা তাইতো পড়ে এসেছি।’
‘ জানে না, জানে না’ বলে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হাম খেয়ে নিল তুতুকে তোতা। আসলে তোতা তুতুকে একটু বড্ড বেশি ভালোবাসে। লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই! স্থান-কাল তার জ্ঞান নেই। পক্ষীকুলের বোধহয় এরকমই স্বভাব। ভালোবাসাতে এসব কিছু থাকে নাকি?
আমি একটু রেগে গিয়ে অপমানিত বোধ হয়ে বললাম, ‘বল দেখি, তোতা তুমি কি জানো?’।
তোতা বলল, রাজা রামমোহন রায় ১৭৭৪ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেন। এর ২১ বছর পর হুগলি জেলার জন্ম হয়। তাহলে তিনি হুগলি জেলায় জন্মালেন কি করে? এবার ইংরেজিতে বলল,’ Hooghly Zilla separated from Burdwan, Regulation XXXVI of 1795 for excessive work and unwieldy size of Burdwan.’
ঠিকই তো রাজা রামমোহন তো বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন রাধানগর গ্রাম ছিল বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত। তাহলে আমাদের বলা দরকার, রাজা রামমোহন রায় বর্ধমান জেলায় রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটি বর্তমানে হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত।
তোতার কথা ভাবতে ভাবতে আমি বটতলা থেকে আমি আমার পাঠশালায় চলে এসেছি। কে মূর্খ, কে পণ্ডিত ভাবতে ভাবতে সারারাত বইয়ের পাতা উল্টেছি। তোতা মিথ্যা বলেনি।
আজকেও আর এক কান্ড ঘটলো। ভয়ে ভয়ে বটতলা দিয়ে আসছি। আবার তোতার প্রশ্ন, ‘বলতো পন্ডিত, পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেটা তখন কোন জেলায় ছিল?’
তোতা বড় দুষ্টু। আমাকে বারবার অপদস্ত করে। তবে এটা ভালো যে অন্য কোন মনুষ্যকুল আমার আর তোতার কথা শুনতে পায়না। আমি বললাম, ‘কেন মেদিনীপুর জেলায়’। আবার তোতা বলে, ‘হয়নি, হয়নি।’
এবার তোতা বলল ১৭৯৫ সালে যখন হুগলি জেলা জন্ম হয় তখন ঘাটাল আর চন্দ্রকোনা এই হুগলি জেলায় ছিল। দীর্ঘ ৭৭ বছর থাকার পর ১৮৭২ সালের এরা দুজনেই একসাথে মেদিনীপুরে চলে গেল আর ফিরে এলোনা। এরা বড় অভিমানী। এরপর কান্না শুরু করলো।
আমি বললাম, তাহলে বিদ্যাসাগর বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও তখন সেটা ছিল হুগলি জেলায়?
তোতা রেগে গিয়ে আবার ইংরেজি বলতে শুরু করল,’ ‘ Thana Jehanabad and Goghat transferred to Burdwan from Hooghly,Notification dated 17th June,1872.
Ghatal and Chandrakona transferred to Midnapur from Hooghly, Notification dated 17th June,1872.’
আমি বললাম, তাহলে কি আমাদের বলা দরকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হুগলি জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটি বর্তমানে মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত?
তোতা বলল, তুমি কি বলবে এটা তোমার ব্যাপার। মনুষ্যকুল বিশেষ করে বাঙালিদেরকে আমি বিশ্বাস করিনা,বড় তর্ক করে। তবে মনে রেখো, রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মতন মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন এটাই বড় কথা। এটা কোন জেলায় এটা বিষয় নয়? এইসব মনীষী স্থান-কালের ঊর্ধ্বে। তবে সত্যটা জেনে রাখা দরকার।
চলে আসবো বলে ভাবছি। তোতা আমাকে আবার ডাকল। আবার কাঁদতে শুরু করে বলল, জাহানাবাদ(আরামবাগ), গোঘাট, ঘাটাল আর চন্দ্রকোনা হুগলি জেলার চারকন্যা মায়ের কাছে (হুগলি জেলায়) দীর্ঘ ৭৭বছর থাকার পর, ১৮৭২ সালে চারজন একসাথে চলে যায়। জাহানাবাদ (আরামবাগ) আর গোঘাট সাত বছর পর ফিরে এলেও ঘাটাল আর চন্দ্রকোনা এখনো ফিরে আসেনি। আবার তোতা তার প্রাণের তুতুকে একটু আদর করতে শুরু করলো। পক্ষীকুলের স্বভাব বুঝি এইরকমই হয়!
তারপর মুচকি মুচকি হেসে বলল, ‘এই যে মা সারদা শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দেখার জন্য পায়ে হেঁটে ভালিয়ার (ডাকনাম তেলো ভেলো) ওপর দিয়ে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন, রাত্রিবেলায় ভীম ডাকাতের পাল্লায় পড়ে। তখন ভালিয়া কোন জেলায় ছিল?
মনে মনে ভাবছি আর স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছি। ১২৮০ বঙ্গাব্দের কিছু পরে ৩ রা চৈত্র সম্ভবত ঘটনাটা ঘটেছিল। ইংরেজি হবে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ।১৮৭২ থেকে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ জাহানাবাদ (আরামবাগ) বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাহলে সেটাতো বর্ধমান জেলার হওয়া উচিত। আমাদের বলা উচিত মা সারদা বর্ধমান জেলার ভালিয়া গ্রামে ডাকাতের পাল্লায় পড়েছিলেন, এই গ্রাম বর্তমানে হুগলি জেলায় অবস্থিত।

এইসব অদ্ভুত ইতিহাস ভাবতে ভাবতে কাল রাত্রে ঘুমাতে পারিনি। আপনারা ঘুমাবেন, আমি ঘুমাবো না, সে কি করে হয়?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

A SUMMARY OF THE CHANGES IN THE JURISDICTION OF DISTRICTS IN BENGAL 1757-1916.

WEST BENGAL DISTRICT GAZETTERS
By
MONMOHAN CHAKRABATTY
1918

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *