””         ছোটগল্প : জীবনচক্র : বিপ্লব নন্দী – Arambagh Times
Fri. Jan 22nd, 2021

Arambagh Times

কাউকে ছাড়ে না

ছোটগল্প : জীবনচক্র : বিপ্লব নন্দী

1 min read

মধুরিমাকে ঘিরে বসে আছে সকলে। ‘নিভৃতি’ বৃদ্ধাশ্রমের হলঘর। সকলে মানে, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছনো লোলচর্ম কতগুলো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। কিছু সাংবাদিক। দু-তিনটে এনজিওর প্রতিনিধি। আরও কয়েকজন। যাদের মধ্যে আছেন, রিটায়ার্ড জাস্টিস, রেল বোর্ডের অফিসার, রিটায়ার্ড আমলা। আর আছে তারই সঙ্গে ‘নিভৃতি’তে থাকা তার সহ-আবাসিক, মানিকদা, অরু, সুতপা, মিলিদি, অমৃতাদি আর তপু। তপু, মধুরিমার থেকে কয়েক মাস ছোট। বাকি সবাই বড়ই হবে। তবে সবাই ষাটের ওপরে। নইলে কি আর বৃদ্ধাশ্রমের চৌহিদ্দির মধ্যে থাকার সুযোগ মিলতো! মধুরিমা, সকলকে একটা নতুন বিষয় সম্পর্কে শোনাচ্ছে। নতুন করে জীবন শুরু করার বিষয়। আসলে রিমা জীবনে কখনও থেমে থাকেনি। জোয়ার ভাঁটা জীবনে বহুবার এসেছে। সে সবকিছুকে কাটিয়ে নিয়ে জীবন পথে এগিয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে তার মনে পরে গেল জীবনের আগের দিকের কথা। সতেরো বছর বয়সে চকবাজারের বাবার বাড়ির অমতে রজতের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে দয়াময়ী তলায় বিয়ে করা। শশুড় বাড়িতও লাঞ্ছনা গঞ্জনা। সেসব সে গায়ে মাখেনি কখনও। কারন তার ভালোবাসার জন, তার সব দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে রাখতো তার উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু একটা কষ্ট তার একেবারেই না ভুলে থাকার মতোই ছিল। সন্তান না হওয়ার কষ্ট। নিজেকে বড্ড অপূর্ণ মনে হতো। শশুড় বাড়িতে শাশুড়ি ও অবিবাহিত ননদের অত্যাচার মাত্রা ছাড়ালে রজতকে নিয়ে চুঁচুড়ায় আলাদা সংসার পাততে বাধ্য হয়েছিলো। সে অর্থে, অর্থের অভাব ছিল না। তাই কোনও অসুবিধা হয়নি। রজত, ডানলপ ফ্যাক্টারীর একটা ডিপার্টমেন্টের ইনচার্জ ছিল। হপ্তায় পেমেন্ট হতো। অনেক সরকারি বাবু বা মাষ্টারদের চারগুণ ছিল মাইনে। সকলেই চোখ টাটাতো। কিন্তু রজতের ছিল এক বদদোষ। প্রচন্ড ফুর্তিবাজ। পয়সা রাখতে পারতো না, সব উড়িয়ে দিত। বলতো, “কি হবে পয়সা জমিয়ে?” “আমাদের কে আছে, খাবার!” “আজকের দিনটা ভালোভাবে বাঁচলেই তো হলো…!” মধুরিমা কিন্তু ঠিক রজতের থেকে পয়সা সরিয়ে রেখে ঘরের অনেক অ্যাসেট করেছিলো। দুটো জীবন বীমাও করেছিলো। আর আলাদা করে রেকারিং করে কিছু নগদ টাকাও জমিয়েছিলো। সবই ঠিক ছিল। কিন্তু টনটন করতো ঐ একটা জায়গায়। মা ডাকার কেউ নেই। এটা যে কত বড় অপ্রাপ্তি সেটা, কেবল একজন মা-ই জানে। তাই রজতকে রাজী করিয়ে বিয়ের নয় বছর পর যখন, যখন অনাথ আশ্রম থেকে দুবছরের রঞ্জুকে ও নিয়ে এলো তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মনে হয়েছিলো। রজতও যখন জীবনে প্রথম আধোস্বরে, ‘বাবা’ ডাক শোনে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলেছিলো। তখন সুখের মুহূর্ত চলছিলো। মুখের প্রথম বুলি থেকে পায়ে পায়ে হাঁটা শেখানো থেকে, যখন একটা রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার এক্জিকিউটিভ ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে যোগদান করলো তখন রিমা মানে মধুরিমার মনে হয়েছিলো যে তার সত্যিকারের পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়েছে। কেটে গেলো আরও কিছু বছর। রজতের ফ্যাক্টারী লক-আউট। খোলে, আবার বন্ধ হয়। মালিকানা পরিবর্তন হয়। আবার খোলে। আবার একেবারের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। রজত একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। সেরিব্রাল অ্যাটাক। কোমরের নিচের অংশ প্যারালিসিস। পঙ্গু স্বামী, ছেলের ইংলিশ মিডিয়ামের পড়ার খরচ, বাড়ি ভাড়া, সংসার, আরও আরও অনেক কিছু…! কি হবে! কিভাবে চলবে! রিমা ভেঙ্গে পড়ার মানুষ না। পরিস্থিতি আরও শক্ত করে দেয়। শক্তি জোগায়। জমানো টাকা থেকে পুঁজি করে কাপড়ের ও সায়া ব্লাউজের ব্যবসা শুরু। বীমার টাকায় রজতের চিকিৎসাও চলছিল। মাদ্রাজ বা বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি। রজতই চায়নি। ছেলের পড়াশুনা ও সংসার চালিয়ে ছোট্ট একতলা বাড়িটাও রিমার নিজের হাতে গড়া।

কেটে গেছে আরও বেশ কয়েক বছর। রঞ্জু প্রতিষ্ঠিত। বিবাহিত। ছোট্ট ফুটফুটে দুবছরের নাতি। ছোট্ট একতলা বিশাল দোতলায় পরিবর্তিত। রিমার ব্যবসা আর নেই। তার বদলে বৌমা ও বাড়ির বিনা মাইনের ঝি। রজত এ সব কিছু দেখে যেতে পারলো না। রজতের শশুড় বাড়ির প্রতি টানটা খুব বেশি। মা তার কাছে বোঝা। সেই বোঝার ভার এতটাই বেড়ে গেল যে, আজ মধুরিমার ঠাঁই বৃদ্ধাশ্রমে। অনাথ আশ্রম থেকে যাকে এনে মানুষের মতো মানুষ করে উপযুক্ত করে তুলেছিলো মধুরিমা, সেই ছেলেই তাকে অমানুষের মতো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে কি প্রতিদানটাই না দিলো! ভুল করেছিলোসে নিজেও। বাড়ি এবং সবকিছু ছেলের নামে এত তারাতারি লিখে দিয়ে। তার বৌমা তাকে বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে উঠতে পেরেছিলো যে, যেহেতু সে রঞ্জুর গর্ভধারিনী মা নয় তাই তার প্রতি কর্তব্য করা বা না করা কোনটাতেই কিছু এসে যায় না। তার মা তাকে অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছিলো, কেবলমাত্র নিজের সুখের জন্য। সে সুখ তার প্রাপ্ত হয়েছে। তাই তাদের একে অপরের প্রয়োজনটাও ফুরিয়েছে। এখন নতুন যুগ। পুরোনো বস্তাপচা ধ্যানধারনা ওয়ালা আত্মমর্য্যাদা সম্পন্ন এক বুড়ি মহিলা বরং তার আত্মমর্য্যাদা নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমেই থাকুন। এখানে তার কোনও প্রয়োজন নেই। অগত্যা।

ঠিক আছে। বৃদ্ধাবস্থা। বৃদ্ধাশ্রম। কিন্তু, জীবন তো থেমে থাকলে চলবে না। তাকে তো এগিয়ে চলতেই হবে। মর্য্যাদার সঙ্গে, আত্মমর্য্যাদার সঙ্গে। শুধু এবার শুরুটা আলাদা দু-একটা জায়গাতেই- হারানোর কিছু নেই। নিজের কেউ নেই। কাউকে বিশ্বাস করার, ভরসা করার প্রয়োজন নেই। অতএব, মানিকদা, অরু, সুতপা, মিলিদি, অমৃতাদি আর তপুকে মধুরিমা বুঝিয়ে দিয়েছে ও কি চায়। একটা এনজিও তৈরি করতে, যারা শহর জুড়ে কাজ করবে প্রতিটা বাড়িতে ঘুরে ঘুরে যাদের বাড়িতে বয়স্ক মা বাবা, দাদু দিদারা আছে, তাদের অবশিষ্ট জীবনের নিরাপত্তা ও সাচ্ছ্যন্দ যাতে মর্য্যাদার সঙ্গেই পালন করা হয়ে থাকে। ভবিষ্যতে যেন তাদেরকে অনাথ না হতে হয়। মধুরিমার পরিকল্পনা তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে তো বটেই, এমনকি সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও এধরনের ভাবনা চিন্তা রূপায়নের জন্য জনমত চাওয়া হয়েছিলো। তাতে বিরাট সাড়া পড়ে।মানিকদা, অরু, সুতপা, মিলিদি, অমৃতাদি, তপু এবং সকলে মিলেই কোরাসে গলা মেলায়, “মধুরিমা, তুমি এগিয়ে চলো, আমরা তোমার সাথে আছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright © All rights reserved. | Powered by KTSL TECHNOLOGY SERVICES PVT LTD(7908881231).