””         সতীপীঠ খানাকুলের রত্নাবলী কালীমা – Arambagh Times
Mon. Oct 19th, 2020

Arambagh Times

কাউকে ছাড়ে না

সতীপীঠ খানাকুলের রত্নাবলী কালীমা

1 min read

রাজারাম মুখার্জি : আজ আমরা যে সতীপীঠের কথা বলবো সেটি নিয়ে অনেক মতভেদও আছে। কিন্তু তার কিছু শাস্ত্রানুসারে ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় অতএব একবারেই যে সেই মতামত গুলো কে উড়িয়ে দেওয়া যায় সেইরকমটাও নয়। সেই রকমই একটি সতীপীঠ নিয়ে মতামত সম্বলিত আরামবাগ টাইমস-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
রত্নাবলী পীঠ পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় খানাকুলের উবিদপুরে অবস্থিত । মা সতী দেবীর দক্ষিণ স্কন্ধ এখানে পড়েছিলো । দেবীর নাম কুমারী ভৈরবের নাম শিব । আবার অন্য মতে দেবীর নাম শিবা ভৈরবের নাম কুমার । তবে এই পীঠে এখানে ভৈরবের নাম স্থানীয় মতে ঘণ্টেশ্বর । দেবীর অপেক্ষা এখানে ভৈরবের প্রাধান্য বেশী। তাই একে ভৈরব প্রধান পিঠও বলা যায়। পীঠনির্ণয়তন্ত্র বলে-
রত্নাবল্যাং দক্ষস্কন্ধ কুমারী ভৈরব শিবঃ

কবি ভারতচন্দ্র লিখেছেন-
রত্নাবলী স্থান ডানিস্কন্ধ অভিরাম ।
কুমার ভৈরব তাহে দেবী শিবনাম ।।

ঐতিহাসিকদের মতে রত্নাবলী পীঠ এই পশ্চিমবঙ্গেই । “কাব্যমীমাংসা” শাস্ত্রে রত্নাবতী নামে একটি নগরের বর্ণনা পাওয়া যায় । এটি হুগলী জেলার রত্নাকর নদীর ধারে । মহালিঙ্গাষ্টক তন্ত্রে বলা হয়-
ঘণ্টেশ্বরশ্চ দেবেশী রত্নাকর নদীতটে ।

গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা মতে এই পীঠ মাদ্রাজে বলা হয়। তবে মাদ্রাজে কোথায় তা স্পষ্ট ভাবে বলা হয় নি । কিছু ঐতিহাসিক নেপালে বামগতী ও রত্নাবলী নদীর সঙ্গমে “প্রমোদা” নামক এক তীর্থে এই পীঠ অবস্থিত বলে মনে করেন । ডঃ দীনেশ্চন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গের খানাকুলের উবিদপুরে এই পীঠ অবস্থিত বলে মনে করেন।

পশ্চিমবঙ্গের খানাকুলের উবিদপুরে অবস্থিতা পীঠ দেবী শ্মশানবাসিনী। দেবীর নাম “শিবা”। নামের সাথে দেবীর রূপের পরিচয় পাওয়া যায় । দেবী এখানে কালিকা মূর্তিতে বিরাজিতা । অতি উগ্রা রূপিনী । দক্ষিণা কালীর মুখাবয়বের সাথে দেবীর মিল দেখা যায় । কথিত আছে যেহেতু দেবী কুমারী তাই এখানে দেবীকে সিঁদুর দেওয়া হয় না। এছাড়াও দেবীর আদেশে এই মন্দিরের ভেতরে কোনো বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা নেই। আলো বলতে মোমবাতি এবং প্রদীপের আলো। অতীতে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিভিন্ন রকমের বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন সেবাইতরা তারপর থেকেই আর বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করেননি তারা।

হুগলী জেলার রত্নাকর নদীর তীরে এই পীঠ অবস্থিত । যদিও এখন নদী মজে গিয়েছে । স্থানীয় জনশ্রুতি এই যে একসময় রত্নাকর নদীর জল এই পীঠের কুণ্ডের জল স্পর্শ করে যেতো । সে বহু আগের ঘটনা । কথিত আছে, এই রত্নাকর নদীতে একদিন অভিরাম গোস্বামী ঠাকুর স্নান করার সময় তার কৌপিন ভাসিয়ে নিয়ে যায় নদীর স্রোত। তখনই তিনি অভিশাপ দেন যে তুই মজে যাবি তারপর থেকেই সেই নদী ছোট হতে থাকে এবং বর্তমানে স্থানীয়রা এই নদীকে কানানদী বলে ডাকে । এই পীঠে মায়ের অপেক্ষা বাবা ভোলানাথের মাহাত্ম্য বেশী। অনেকেই এই স্থানেই শক্তিপীঠের নাম সম্বন্ধে জানেনও না । ভৈরব ঘণ্টেশ্বর দর্শন করে যান । হুগলীর খানাকুলের উবিদপুরে নদী তটে শ্মশান । দিবারাত্র সেখানে শবদাহ চলত। যদিও বর্তমানে এখানে বৈদ্যুতিক চুল্লির ব্যবস্থা করা হয়েছে।এইখানেই অবস্থিত দেবী শ্মশানবাসিনী । শক্তিপীঠের একটি বৈশিষ্ট্য দেবীর পীঠের সংলগ্ন শ্মশান ঘাট থাকবেই ।

শোনা যায় তন্ত্র আচার্য সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই মন্দিরে পূজো করতেন । তিনি সাধক রামপ্রসাদ সেনের তন্ত্র গুরু । কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মহাশয় নবদ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন । ৬৪ তন্ত্র উদ্ধার সাধন ও প্রনয়ন তিনিই করেন । শক্তি উপাসকেরা এই মহান তন্ত্রগুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মহাশয়ের কাছে চিরঋণী । কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এর সাধন ক্ষেত্রেও এই থানারই রাধানগর গ্রামের মা আনন্দময়ী মন্দির সংলগ্ন মহাশ্মশান। শুধু তাই নয় বর্তমানে আমরা যে দক্ষিণা কালীর করালবদণা, আলুলায়িত কেশ রাশি, শিবের বুকে চরণ রেখে জিহ্বা বের করা রূপ দেখি সেটিও প্রবর্তন করেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ । বহু পূর্বে কালী দেবীর উপাসনা কেবল শ্মশানে তান্ত্রিকেরাই করতেন । কালী কৈবল্যদায়িনী, অজ্ঞানতিমিরনাশিণী , ভববন্ধন মোচনকারী । কালীর উপাসনায় কৈবল্য বা জ্ঞান লাভ হয় । সকল প্রকার জড়তা নষ্ট হয় । এরপর ধীরে ধীরে কালীর উপাসনা গৃহস্থ বাড়ীতে হতে থাকে । একদা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বপ্নে মা কালীর আদেশ পান- “প্রভাতে উঠে প্রথম যাঁর মুখ দর্শন হবে, সেই রকম ভাবে কালীর মূর্তি নির্মাণ করতে।” সকালে উঠে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম এক অন্ত্যজ মেয়েকে দেখলেন। সে মেয়ের আলুলায়িত কেশ, উন্মুক্ত পদ যুগল, বাম হাতে গোবর নিয়ে ডান হাত দিয়ে ছুড়ে ঘুটে দিচ্ছেন। এমন অবস্থায় সে মেয়েটি সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে দেখে লজ্জায় জিহ্বা বের করলেন। সেই মতোই সাধক মূর্তি নির্মাণ করলেন। সেই মূর্তি তে এখন বহু স্থানে পূজা হচ্ছে । কেউ কেউ বলে মা কালী স্বয়ং ঐ অন্ত্যজ মেয়ের রূপ ধরে এসেছিলেন ।
তাই এই পীঠ নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয় মানুষ এই রত্নাবলী মায়ের প্রতি অশেষ ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং আস্থা রাখেন। স্থানীয়রা ছাড়াও বহিরাগতরা কুন্ডের জলে স্নান করে রত্নাবলী কুমারী মা এবং ঘন্টেশ্বর শিবের পূজা দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright © All rights reserved. | Powered by KTSL TECHNOLOGY SERVICES PVT LTD(7908881231).